fbpx

ভারতে হিন্দু-মুসলিম বিয়ের ঐতিহাসিক রায়

হিন্দু-মুসলিম বিয়ে নিয়ে যুগান্তকারী রায় দিলেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট৷ কেরালার ২৪ বছরের নারী হাদিয়ার বিয়েসংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন, কোনো সাবালক মহিলার বৈবাহিক বিষয়ে কারও মতপ্রকাশের অধিকার নেই৷ বিষয়টি একান্তই তার এবং স্বামীর ব্যক্তিগত বিষয়৷

ঘটনার সূত্রপাত গত বছরে৷ কেরালার একটি হোমিওপ্যাথি কলেজের ছাত্রী ছিলেন হিন্দু পরিবারের সন্তান অখিলা অশোকান৷ সেখানেই প্রণয় হয় মুসলিম ছাত্র শাফিন জাহানের সঙ্গে৷ এর কিছুদিন পর অখিলা-শাফিন বিয়ে করেন৷ ধর্মান্তরিত হওয়ায় বিয়ের পর অখিলা অশোকানের নাম হয়ে যায় হাদিয়া জাহান৷ বিয়ের পর শাফিন-হাদিয়া একসঙ্গে থাকতেও শুরু করেন৷

তবে হাদিয়ার পরিবার বিয়েটি মেনে নেয়নি৷ পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ করা হয়৷ অভিযোগে বলা হয়, এটি একটি ‘লাভ জিহাদ’এর ঘটনা৷ তাদের দাবি, অখিলা বা হাদিয়াকে ভুল বুঝিয়ে ধর্মান্তরিত করেছেন শাফিন৷ এখন তাদের মেয়েকে সিরিয়া অথবা ইরাকে নিয়ে যাওয়া হবে বলেও অভিযোগপত্রে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়৷

অভিযোগে আরো বলা হয়, সিরিয়া বা ইরাকে নিয়ে হাদিয়াকে আইএস জঙ্গিদের ক্যাম্পে রাখা হবে৷ মামলা গড়ায় আদালত পর্যন্ত৷ কেরালা হাইকোর্ট জানিয়ে দেন, ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি৷ সুতরাং, হাদিয়া এবং শাফিনের বিয়ে এখনই মান্যতা পাচ্ছে না৷ হাদিয়াকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তার বাবার বাড়িতে৷

এরপরেই কেরালা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন শাফিন এবং হাদিয়া৷ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের বেঞ্চে ওঠে মামলা৷ প্রথম শুনানিতেই সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, হাদিয়ার মামলাটি স্পর্শকাতর এবং তার সঙ্গে যে ব্যবহার হয়েছে, তা সংবিধানসম্মত নয়৷ হাদিয়াকে ফের কলেজে গিয়ে ক্লাস শুরু করতে বলা হয়৷ হাদিয়ার যাতে ক্লাস করতে কোনো অসুবিধা না হয়, সে বিষয়ে হোমিওপ্যাথি কলেজটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল৷

গত মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দেয়, দুই সাবালকের বিয়ের বিষয়ে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের মতপ্রকাশের অধিকার নেই৷ হাদিয়া এবং শাফিন দু’জনেই প্রাপ্তবয়স্ক৷ তাদের নিজেদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই৷ ফলে তারা একসঙ্গে থাকতেই পারেন৷ এখানে ‘লাভ জিহাদ’এর প্রসঙ্গ টেনে আনার কোনো অর্থ নেই৷ যদি তাদের কারও সঙ্গে আইএস’এর মতো জঙ্গি সংগঠনের সম্পর্ক থাকে, তাহলে তা নিয়ে আলাদা মামলা হতে পারে৷ এনআইএ তদন্তও করতে পারে৷ কিন্তু তাই বলে দু’জনকে আলাদা থাকার নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে না৷

বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ‘লাভ জিহাদ’ শব্দ দু’টি ঘুরে বেড়াচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশের বাতাসে৷ কোনো কোনো সংগঠনের অভিযোগ, মুসলিম সংগঠনগুলো ভালোবাসার মাধ্যমে হিন্দু মহিলাদের ধর্মান্তরিত করছে৷ উত্তরপ্রদেশের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ একদা ‘লাভ জিহাদ’এর বিরুদ্ধে একটি দলও তৈরি করে ফেলেছিলেন৷ ‘লাভ জিহাদ’ বন্ধ করার নামে সংখ্যালঘু অঞ্চলে তারা হিংসাত্মক কার্যকলাপ চালাত৷ হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশের মতো অঞ্চলে ‘লাভ জিহাদ’ নিয়ে বহু জলঘোলা হয়েছে৷ বহু মিশ্র ধর্মের বিয়ের ঘটনা ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়েছে৷ দম্পতিকে প্রকাশ্যে হেনস্তা করা, মারধর করার ঘটনাও ঘটেছে৷

সম্প্রতি অন্য একটি মামলায় সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, ভারতের সংবিধান অনুযায়ী যে কোনো সাবালক ব্যক্তির নিজের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করার অধিকার আছে৷ পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না৷ বিশেষজ্ঞরা মনে করেছিলেন, ‘লাভ জিহাদ’,

সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিয়ে পড়ানো হয়৷ দেনমোহর ধার্য করা হয় ছেলের আর্থিক সামর্থ্য ও অবস্থান অনুযায়ী৷ বিয়ের সময় একজন উকিল থাকেন৷ তিনি প্রথমে কনেকে জিজ্ঞাসা করেন, সে বিয়েতে রাজি আছে কিনা৷ কনে রাজি থাকলে বরকেও একই প্রশ্ন করা হয়৷ এরপর দোয়া কালাম করে সম্পন্ন করা হয় বিয়ে৷

‘অনারকিলিং’ ইত্যাদি বিষয়গুলো মাথায় রেখেই সুপ্রিম কোর্ট সেই রায় দিয়েছিলেন৷ হাদিয়া মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আরও একবার সেই কথাই স্পষ্ট হলো৷ যদিও এনআইএ’এর দাবি এ বিষয়ে তাদের তদন্ত অনেকটাই অগ্রসর হয়েছে৷ কীভাবে ধর্মান্তরিত করে ভারতীয় মহিলাদের জঙ্গি কার্যকলাপে অংশ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে, সে বিষয়ে তাদের তদন্ত চলছে৷ কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট বক্তব্য, দু’টি তদন্তের বিষয় এক নয়৷ জঙ্গি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তদন্ত চলতেই পারে৷ কিন্তু তার সঙ্গে দুই ব্যক্তির ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে জড়ানো কখনোই সংবিধানসম্মত নয়৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *