শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা

বুদ্ধপূর্ণিমা ও তার ইতিহাস

আজ (২৯ এপ্রিল) বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা। এ দিনে মহামতি গৌতম বুদ্ধের জন্ম, বোধিজ্ঞান লাভ ও মহাপরিনির্বাণ লাভ- এই তিনটি ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। তাই বৌদ্ধদের জন্য দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও বুদ্ধপূর্ণিমার দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতি বছরই পালিত হয় বৌদ্ধধর্মের উৎসব হলেওধর্মীয়সম্প্রীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশে সর্বসাধারণের জন্য এই দিনটি সরকারি ছুটি থাকে।প্যাগোডায় চলতে থাকেবৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের দিবস উদযাপনের যাবতীয় কার্যক্রম এছাড়া বিভিন্ন গ্রাম  বিহারে এই দিনে মেলা বসে সবচেয়ে বড়মেলাটিবসে চট্টগ্রামের বৈদ্যপাড়া গ্রামে

যা বোধিদ্রুম মেলা নামে পরিচিত। বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশন দিবসটি উৎসবমূখর এবং ভাবগাম্ভীর পরিবেশে উদযাপনের জন্য রাজধানীর মেরুল বাড্ডা আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তাদের কর্মসূচির মধ্যে সকাল ১০টায় বুদ্ধপূজা, মহাসংঘদান এবং সন্ধ্যে ৬টায় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম প্রধান অতিথি, শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রদূত ক্রিশান্তে ডি সিলভা, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব সম্পদ বড়ুয়া ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করবেন।

বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস খৃষ্টপূর্ব ৫ম শতাব্দী হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিস্তৃত; যা পূর্বে প্রাচীন ভারতের পূর্বাঞ্চল থেকে গড়ে উঠে মগধ রাজ্যের (যা বর্তমানে ভারতের বিহার প্রদেশ) চারদিকে প্রচারিত হয়েছিলো। বৌদ্ধ ধর্ম অস্তিত্ব মূলত সিদ্ধার্থ গৌতমের শিক্ষার উপর ভিত্তি করে। বৌদ্ধ ধর্ম আজ পালনকৃত প্রাচীন ধর্মগুলোর মধ্যে একটি। বৌদ্ধ ধর্মের সূত্রপাত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে শুরু হয়ে মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অব্দি ছড়িয়ে পরে। এক সময় এই ধর্ম পুরো এশিয়া মহাদেশের বেশির ভাগ অংশ জুড়ে প্রভাব বিস্তার করেছিল। এছাড়াও বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাস নানা ধরনের ভাববাদি আন্দোলনের উন্নয়ন যেমনঃ থেরবাদ, মহাযান ও বজ্রযানের মতো বৌদ্ধ ধর্মের অন্যান্য শাখার উত্থান ও পতনের মধ্য দিয়ে চিহ্নিত।

অশোক চক্র, একটি প্রাচীন ভারতীয় ধর্মচক্রের চিহ্ন যা ভারতের জাতীয় পতাকার অংশভুক্ত। সিদ্ধার্থ গৌতম বৌদ্ধ ধর্মের ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি শাক্য রাজবংশের এক ক্ষত্রিয়-ব্রাহ্মণ পরিবারে রাজপুত্র হয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম ও মৃত্যুর সময়কাল নিয়ে এখনও অনেক ইতিহাসবেত্তাদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তাগণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, ৪০০ খৃষ্টপূর্বের কিছু দশক আগে বুদ্ধ মারা গিয়েছিলেন। তাঁর শাক্য-ক্ষত্রিয় বংশের পরিবারগণ ব্রাহ্মণ গোত্রের ছিল, যা তাঁর পরিবার কর্তৃক প্রদানকৃত নাম “গৌতম” দ্বারা নির্দেশিত। উনবিংশ শতাব্দির পন্ডিত এইতেল-এর মতে, সিদ্ধার্থ গৌতমের নাম গৌতম শব্দটি এক ব্রহ্মর্ষি গৌতম থেকে অনুপ্রাণীত।  অনেক বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলোতে বর্ণিত আছে যে, বৌদ্ধ ছিলেন ব্রহ্মর্ষি অঙ্গিরসের বংশধর। 

উদাহরণস্বরূপঃ পালি মহাভাগ্য অঙ্গিরস গ্রন্থে বুদ্ধকে অঙ্গিরস হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে যা মূলত গৌতম বুদ্ধ-কে অঙ্গিরস-সম্প্রদায়ভুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করে। লেখক এবং ইতিহাসবেত্তা এডওয়ার্ড জে. থমাসও বুদ্ধকে ব্রহ্মর্ষি গৌতম এবং অঙ্গিরসের বংশধর হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বৌদ্ধ পরম্পরাগত মতবাদানুযায়ী, সন্ন্যাসী জীবনযাপন ও ধ্যানের মধ্য দিয়ে সিদ্ধার্থ গৌতম ভোগপরায়ণতা এবং স্ব-রিপুদমনের একটি সংযমী পথ আবিষ্কার করেছিলেন। সিদ্ধার্থ গৌতম সিদ্ধিলাভ করেছিলেন মূলত একটি অশ্বত্থ বৃক্ষের নিচে যেটি বর্তমানে ভারতের বুদ্ধ গয়ায় বোধি বৃক্ষ হিসেবে পরিচিত। সিদ্ধিলাভের পর থেকে গৌতম বুদ্ধ “সম্যকসমবুদ্ধ” বা “আলোকিত ব্যক্তিত্ব” হিসেবে পরিচয় লাভ করেছিল।

তৎকালীন মগধ রাজ্যের সম্রাট বিম্বিসারের শাসনামলে বৌদ্ধ তাঁর ধর্ম প্রচারে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন। সম্রাট বিম্বিসার তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মীয়-বিশ্বাস হিসেবে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর রাজ্যে অনেকগুলো বৌদ্ধ বিহার নির্মাণের আদেশ প্রদান করেছিলেন। আর এই বিহারগুলোই বর্তমান ভারতের বিহার অঙ্গ-রাজ্যের নামকরণে ভূমিকা রেখেছিল।

উত্তর ভারতের বারাণসীর বর্তমান হরিণ-পার্ক নামক জায়গাটিতে বৌদ্ধ তাঁর পাঁচ-সঙ্গীকে প্রথম ধর্মদেশনা প্রদান করেছিল। বুদ্ধ সহ তাঁর এই পাঁচ সন্ন্যাস সহচর মিলে প্রথম সংঘ (ভিক্ষু বা সন্ন্যাসীদের দ্বারা গঠিত সম্প্রদায়) গঠন করেন। বিভিন্ন বৌদ্ধ-গ্রন্থ অনুযায়ী,  প্রাথমিক অনিচ্ছা থাকার সত্ত্বেও গৌতম বুদ্ধ পরে সন্ন্যাসীনিদেরও সংঘের আওতাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীনিদের “ভিক্ষুণী” হিসেবে অভিহিত করা হয়। বুদ্ধের মাসী এবং তাঁর সৎ-মা মহাপজাপতি গোতমী ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের প্রথম ভিক্ষুণী। খৃষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দিতে তিনি ভিক্ষুণী হিসেবে সন্ন্যাস পদ গ্রহণ করেন।

জানা যায়, বুদ্ধ তাঁর অবশিষ্ট জীবনের বছরগুলোতে ভারতের উত্তরাঞ্চল ও অন্যান্য গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলগুলোতে পরিভ্রমণ করেন। বুদ্ধ কুশীনগরের পরিত্যাক্ত এক জঙ্গলে দেহত্যাগ বা মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। জনশ্রুতিতে শোনা যায় যে, মারা যাওয়ার পূর্বে বুদ্ধ তাঁর শিষ্যদের বলে গিয়েছিলেন যে, তাঁর প্রচার করা ধর্মীয়দেশনাই হবে তাদের নেতা যা তাদের দিক-নির্দেশনা প্রদানে সহায়তা করবে।

পূর্ববর্তী অড়হৎরা গৌতমের মুখ-নিঃসৃত বাণীকেই ধর্ম এবং বিনয়ের (শৃঙ্খলা ও সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার নিয়ম) প্রাথমিক উৎস হিসেবে অভিহিত করেছিল। কিন্তু বাস্তবে বুদ্ধের কোন মুখ-নিঃসৃত বাণীরই হদিস মিলে নি। পালি, সংস্কৃত, চৈনিক ভাষা ও তিব্বতি ভাষায় যে ত্রিপিটক ও ধর্মীয়গ্রন্থগুলো পাওয়া যায় তা মূলত স্থানীয় মানুষদের মৌখিক বর্ণনা থেকে সংগৃহীত।

এ ছাড়া বাংলাদেশে অবস্থানরত বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের প্রধানরা উপস্থিত থাকবেন। বুদ্ধপূর্ণিমা উপলক্ষে রোববার সরকারি ছুটির দিন। রাজধান ী ছাড়া সারাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

%d bloggers like this: